Muktokolom

কলমের স্পর্শে শুদ্ধ হোক পৃথিবী

জাতের নামে বজ্জাতি

জাতের নামে বজ্জাতি 

শেক্সপিয়ার কোন ধর্মের ছিলেন? অথবা তাঁর গায়ের রং কি ছিল! কালরাম নাকি ধলোরাম? তাঁর রাজনৈতিক বোধ বিবেচনা দর্শনই বা কি ছিল?

অথবা পিকাসো!
তার রাজনৈতিক মতাদর্শ কি ছিল? তিনি কি ফ্রেন্স রেভ্যুলেশনের পক্ষ শক্তি নাকি বিপক্ষ! ম্যাক্সিম গোর্কী কোন ধর্ম পালন করতেন? তিনি কি নিয়মিত চার্চে যেতেন? নাকি বাবা-মাকে চার্চে যাবার কথা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা এক টিকেটে দুই ছবি দেখতে চলে যেতেন!

আচ্ছা, সে দূর দূরান্তের ব্যাপার। আগেকার দিনে নাকি আমাদের মুরব্বীগণ সৌদি আরবের উদ্দেশে হজের নিয়তে যাত্রা করে দিন চল্লিশেক হেটে, সাঁতরে মুম্বাই সমুদ্রতটে গিয়ে পৌঁছাতে পারলেই চলতো। সৌদি না যেতে পেরেও দেহে প্রাণ নিয়ে ফেরত আসতে পারলেই তাদের নাকি গালা সংবর্ধনা দেওয়া হতো। সেই বোম্বাই হাজীসাবকে দেখতে দূর দূরান্ত থেকে মানুষজন আসতেন। সেখানে ফ্রেন্স বিপ্লব, রেনেসাঁ এগুলো নিয়ে কথা বলাটা নিরাপদ মনে করছি না।

বরং আশেপাশেই থাকি। রবি ঠাকুর- উনার দর্শন কি ছিল, চরিত্রই বা কেমনতর, বিশ্বাসই বা কি? তাদের লিখাগুলোর মান বাদ দিয়ে ব্যক্তি লেখকজীবন নিয়ে গবেষণা করতলে করার পরে যদি বিবেচনা করতে হত তাদের রচিত সাহিত্য পড়ব কি না তাহলেই সব্বনাশ; জ্ঞান না করেই পেট শুকিয়ে হা-জ্ঞান হয়ে মরতে হতো বৈকি!

কাটলেম যখন, না হয় আরেকটু ঠোঁট কাটি!

কাজী নজরুল ইসলাম!

আমাদের জাতীয় কবি যে দ্বিতীয় বিয়ে একজন হিন্দু নারীকে করেছিলেন, এই খবরটা সকলে মোটামুটি জানি। উনি কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়েছিলেন!

নজরুল ইসলাম সেই আশাপূর্ণা সেনগুপ্তকে কি নাম দিয়েছিলেন জানেন তো! প্রমীলা দেবী। তিনি তাঁর স্ত্রীকে কি যে ভালবাসতেন তাদের ৩৮ বছরের দাম্পত্য জীবনের দিকে তাকালে সহজেই বোধগম্য। বিয়ের কাবিনে কি লিখা ছিল জানেন তো। আশাপূর্ণা দেবী চাহেন তো ইসলাম গ্রহন করিবেন, এ ক্ষেত্রে কেহ কাউকে জবরদস্তি করিবে না। মুসলিম কবি বলে আমরা যারা কাজী নজরুলকে সবচেয়ে বড় কবি হিসেবে দুন্দুভিতে দ্রিমিদ্রিমি দামামা বাজানোর চেষ্টা করি, তারা কি একথা জানি, জানলেও কি কখনো মানি বা কাউকে বলতে শুনি, সেই হিন্দু রমনী- প্রমীলা দেবী তাঁর জীবদ্দশায় নজরুলের সাথে একঘরে একটা ছাদের নীচে সংসার করেও হিন্দু ধর্মকর্মাদি পালন করেছেন; সেটিও আবার রীতিমতো সকাল বিকেল ঘরের কোণে দেবী বসিয়ে, দুর্বা ছিটিয়ে, ধুন জ্বালিয়ে, উলু দিয়ে পুজো করে। কই মানবধর্মের কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করতে বলেননি। একজন সনাতন ধর্মের নারীর সাথে ঘর-সংসার করছেন বলে তো তাঁর সমস্যা হয়নি। বরং লোকসমাজকে নিদারুণ শতভাগ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চার চারটি সন্তানের গর্বিত পিতা হয়েছেন, তাদেরকে লালনপালন করেছেন। সন্তানদের নামগুলোও রেখেছেন হিন্দু-মুসলিম মিশ্রণে। আপনার কি মনে হয়, নজরুল ইসলাম ধর্মের বিধিবিধান জানতেন না! তিনি কি জানতেন না, মুসলমানেরা কোন হিন্দু ধর্ম অথবা অন্য যেকোন ধর্মের নারী-পুরুষ যতক্ষণ ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহন না করছেন, তাকে বিয়ে করতে পারেন না!

ছে ছে ছে।
যে কবি এতবড় অধর্ম করে গেলেন তাকে মুসলমান কবি বলে আপনাদের এত নাচানাচি! ধর্মের অবমাননাকারী সে কবিকেই বলছেন মুসলিম রাষ্ট্রের জাতীয় কবি! জাতের নামে বজ্জাতি করা নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের সাথে তুলনা করছেন।

লাজে মরি, নজরুল-রবীন্দ্রনাথ আপনার আমার আমাদের সমাজের ভাবনা থেকে অন্তত আরো একশবছর এগিয়ে ছিলেন। তারা প্রকৃত কবি বলেই মানবদর্শন লালন ও পালন করে আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন।

একথা সেকথা, এবার এবার আসল কথা। এত এত কবি সাহিত্যিকগনের সৃষ্ট সাহিত্যের বিচার নিশ্চয় তাঁর ধর্ম-কর্ম-জীবনাচরণ-রাজনৈতিক মতাদর্শ-চরিত্রের গঠন বিবেচনা করে করা হয়না। যদি তাই করা হতো, পৃথিবীর তাবত নামীদামী কবি সাহিত্যিকদের নাম মুখ দিয়ে উচ্চারণ করামাত্র তো মহাপাপ হয়ে যেত।

তা যখন হয় না, তাদের রচনাগুলোই যেখানে তাকে বিচার করার জন্য মূল বিবেচ্য, সেখানে এ দেশেরই একজন আল মাহমুদকে নিয়ে আমাদের এত চুলকানি, ভদ্র ভাষায় যাকে বলে এলার্জি, তা কেন? আমার কাছে তাঁর জীবন, দর্শন, মতাদর্শ, ধর্ম, রাজনৈতিক বিশ্বাস কোনভাবেই বিবেচ্য নয়, বরং বিবেচ্য তাঁর সৃষ্টি।

কেউ যদি আমার ঘরাণার, আমার মতাদর্শের কবি সাহিত্যিক না হয়, তবে কি- তাঁর সৃষ্টিকে আমরা বাজেয়াপ্ত করে দিব ? ব্যক্তি আদর্শকে আমরা অস্বীকার করতে পারি, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট শিল্প ও সাহিত্য কর্মকে নয়। কবি আল মাহমুদ তেমনি এক বিশাল মাপের,দারুন মেধাবী একজন প্রকৃত সাহিত্যিক।

কবিকে অবজ্ঞা করার কোন অধিকার কি আমাদের আছে! কবি শামসুর রাহমান, একজন হেলাল হাফিজ বা নির্মলেন্দু গুন – কবি হিসেবে যতটা পূজনীয়, একজন আল মাহমুদ, একজন ফররুক আহমদ, একজন আরজ আলী মাতুব্বর, আহমেদ শরীফ বা আহমেদ ছফারা, ঠিক একইভাবেই গ্রহনীয় বরণীয় ও পূজনীয়।

*লেখক –
কবি ও কথাসাহিত্যিক

শেয়ার করুন
আপডেট : এপ্রিল ৭, ২০১৮ — ৮:৫৪ অপরাহ্ন

মন্তব্য করুন

Muktokolom © 2017 রুদ্র আমিন