Muktokolom

কলমের স্পর্শে শুদ্ধ হোক পৃথিবী

ভবিতব্য কবি সাহিত্যিক একটু দাঁড়ান। লাইক দেবার দরকার নাই, পড়ুন।

আমার দ্রোহ, আমার প্রেম ; কবি শঙ্খ ঘোষ
——— মেহেদী হাসান তামিম

(কিছু প্রাসঙ্গিক কথা-
উনার সম্পর্কে খুব বেশী স্বচ্ছ ধারনা ছিলনা আমার। দুই আড়াই মাস আগে অন্তর্জালে কবিতা পড়তে পড়তে হঠাৎ একজনের কবিতায় মুগ্ধতায় চোখ আটকে গেল। তারপর তাঁর আরো একটা পড়লাম—তারপর আরো একটা–এভাবে পড়তে পড়তে মাঝখানে কয়েকদিন একটা ঘোরের মধ্যে পার হয়েছি। মিলানোর চেষ্টা করেছি কিভাবে সম্ভব একজন মানুষের পক্ষে এভাবে লিখা। মনে হলো এতদিন কি জিনিসটা না মিস করেছি!

আমি নিজেও যেহেতু তেমনভাবে উনার ব্যাপারে এতটা জানতাম না, তাই নতুন প্রজন্মকে উনার লিখা নিয়ে কিঞ্চিত কিছু হলেও জানানোর তাড়নায় এই প্রবন্ধটি লিখা। কারো ন্যুনতম একটু উপকার হলেও আমার এ পরিশ্রমটি সার্থক হবে।)

আমি কবি হিসেবে কতটুকু পারি কতটুকু জানি সেটা পুরোপুরি না জানলেও যতটুকু আমার প্রতীতি আমাকে সাড়া দেয় তাতে বুঝি তাকে নিয়ে কিছু লিখবার যোগ্যতা বিন্দু পরিমানেও নেই আমার।

যখন সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হয়, স্বপ্রণোদিত হয়ে দায়িত্ব নিতে হয়। সে তাগিদ থেকেই তাকে নিয়ে লিখছি।

কেউ কেউ বলেন আধুনিক কবি, কেউ বলেন ছন্দের কবি। আমি তার সাথে আরো বলি মানবতার কবি, বিপন্নতায় প্রতিকূলতায় যার লেখনীকে ভরসা করা যায়, তিনি সেই কবি, তিনি বাংলা ভাষার কবি, তিনি বিশ্বাস ও প্রেমের কবি, তিনি আমার শঙ্খ ঘোষ। না, তার কোনও ব্যবচ্ছেদ আমি করবনা সে যোগ্যতা আমার নেই আমি আগেই বলেছি, শুধু তার কিছু অমোঘ কবিতার অবিস্মরণীয় পংক্তি এ প্রজন্মের পাঠকের কাছে, নতুন কবির কাছে তুলে ধরতে চাই।

যে কবির প্রথম কবিতাটি তার নিজ দেশে ছাপার হরফে মুদ্রিত হলো তা ১৯৫২ সাল। তবু তার ৬৭ বছর পরে আজকের এ দিনে দাঁড়িয়েও তাঁর সেই কবিতাটি পড়লে মনে হবে, আরে এ তো আমাদেরি কথা, হুবুহু আমার চারপাশের দেখা গল্প সব। কবি তো আসলে এমনই হতে হয়, যিনি চোখ খোলা অবস্থায় দেখবেন নিজের বর্তমান পরিপার্শ্বিক, আর চোখ বন্ধ করলেই তিনি দেখবেন সুদূর কোন ভবিষ্যতের ছবি।

যদিও প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোতে কল্পনাপ্রবন আবেগপ্রবন বলে কবিসাহিত্যিকদের রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য সরাসরি অযোগ্য ঘোষণা করেছিলেন। সরদার ফজলুল করিম স্যারের এক প্রবন্ধে পড়েছিলাম যে সমাজে কবিরা, লেখকরা বাস্তব অবস্থা, সত্য ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে শুধু তোষামুদে সাহিত্য, পুরস্কার প্লট ফ্লাট প্রাপ্তির সাহিত্য, রাষ্ট্রীয় কবির আসনলিপ্সার সাহিত্য রচনা করে, সে সমাজে ধ্বংস অতি আসন্ন, সে সমাজের ভগ্নস্তুপে পরিণত হবার দিন কাছের দিনেই।

খুব বিষ্ময়ান্বিত হই আমাদের রচনা যখন সেই সুদীর্ঘ অতীতের কোন কবির কাছে মুখ থুবড়ে পরে, নিমিষেই মিলিয়ে যায়। কবি শঙ্খ ঘোষ এমনিতর একজন কবি যিনি তাঁর সময়ে দাঁড়িয়ে সে সময়ের কথা, সে সময়ের অনেক পরের কথা অব্যর্থ ভাবে, দ্ব্যর্থহীণ দ্যোতনায় তুলে ধরেছেন। ১৯৫২ সালে তাঁর যে কবিতাটি প্রথম ছাপানো হলো –

“নিভন্ত এই চুল্লিতে মা
একটু আগুন দে,
আরেকটুকাল বেঁচেই থাকি
বাঁচার আনন্দে!
নোটন নোটন পায়রাগুলি
খাঁচাতে বন্দী-
দুয়েক মুঠো ভাত পেলে তা
ওড়াতে মন দিই!
হায় তোকে ভাত দেবো কী করে যে ভাত দেবো হায়
হায় তোকে ভাত দিই কী দিয়ে যে ভাত দিই হায় ”

অথবা

“যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে
যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে দিয়ে
বিষের টোপর নিয়ে!
যমুনাবতী সরস্বতী গেছে এ-পথ দিয়ে
দিয়েছে পথ গিয়ে !
নিভন্ত এই চুল্লিতে বোন আগুন ফলেছে ! ”

কবিতাটি এক কিশোরীর গল্প। যে আমাদের কারোর হয়ত খুব চেনা কোন প্রতিবেশী, যার মৃত্যু রচিত হয় পুলিশের গুলিতে এক ভুখা মিছিলে গিয়ে । ভাতের জন্য মৃত্যু, ভাতের সন্ধান তাকে এনে দেয় গরম বস্তু তবে সেটা বিষময় বুলেট । সব বারুদের কাছে , মৃত্যু এসে মাথা নুয়ায় । নিভন্ত চুল্লি সেই কিশোরীরই দহনে দাউদাউ চিতার অগ্নিময়তা ।

তিনি আরো পরে লিখলেন —

“ভয়াবহ শব্দধূমে ভরে গেছে পৌষের বাতাস
আর সেই অবসরে কোনও কোনও পিশাচ স্বাধীন
রাজপথ থেকে নারী তুলে নিয়ে চলে যায় ট্রাকে ।”

সমাজকে মোলায়েম ভাষায় দেখিয়ে দিলেন নারীত্বের অসম্মান । আজও এ সময়েও যা সমান প্রাসঙ্গিক । নারী আজও ধর্ষিত হয় পাবলিক বাসে, ব্রিজের আড়ালে , প্রকাশ্য রাজপথে, বনানী আর ধর্মতলায়।

কি প্রতিপন্ন বিপন্নবোধ জাগে যখন তিনি লিখেন-

” আজকাল কবিমাত্রে অনায়াসে জঙ্ঘা বলে যাকে
শব্দের প্রকৃত বোধ কুয়াশায় একা পড়ে থাকে ”

কি নির্দ্বিধায় আত্মবিশ্বাসী সংজ্ঞায়ন করেন –

” মত কাকে বলে, শোনো । মত তা-ই যা আমার মত
সেও যদি সায় দেয় সেই মতে তবে সে মহৎ ”

বিশ্বায়নের টালমাটালি বাতাসে গণতন্ত্র তো আমার কথা, আমার সরকার, আমার রাষ্ট্র। সবকিছু যদি আমার হয় তবেই তার সব ঠিক। এমনকি আরো স্পষ্ট করে লিখলেন কবিতা – ‘ন্যায় অন্যায় জানিনে’ ।

“ন্যায় অন্যায় জানিনে
তিন রাউন্ড গুলি খেয়ে তেইশ জন মরে যায়, লোকে এত বজ্জাত হয়েছে !
স্কুলের যে ছেলেগুলো চৌকাটেই ধ্বসে গেলো, অবশ্যই তারা ছিল
সমাজবিরোধী।
ও দিকে তাকিয়ে দ্যাখো ধোয়া তুলসিপাতা
উল্টেও পারেনা খেতে ভাজা মাছটি আহা অসহায়
আত্মরক্ষা ছাড়া আর কিছু জানেনা বুলেটরা।
দার্শনিক চোখ শুধু আকাশের তারা বটে দ্যাখে মাঝে মাঝে।
পুলিশ কখনও কোনও অন্যায় করে না তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ।”

কি অবলীলায় শঙ্খ কত দুর্দান্ত। কবিতার লাইন কতটা প্রতিবাদী হতে পারে মাত্র সে ক’টি লাইনেই তা দেখিয়ে দিলেন –
‘তিন রাউন্ড গুলিতে তেইশ জনের মৃত্যু। ‘
অথবা
‘পুলিশ কখনও কোনও অন্যায় করে না তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ’ – এর থেকে বড় চপেটাঘাত আর কি হতে পারে!

বাম প্রশাসশাসকের রাজ্যে, জ্যোতি বসুর প্রিয় পাত্র হয়ে আর দশজনেশজনের মতো ক্ষমতাশালীদের পদযুগল লেহন ও বক্ষে ধারণ করে কাজী নজরুল ইসলামের মোসাহেব কবিতার সেই ধুরন্ধর মোসাহেব হবার সুযোগ তাঁর ছিল অবারিত। কিন্তু তিনি তো কবি তাও আবার কবি শঙ্খ ঘোষ, তিনি তো সে পথে হাঁটার লোক নয়। যেকোন অন্যায়ে হোক তা রাজ্য সরকারের, হোক কেন্দ্র সরকারের অথবা প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, নাগরিক কারো রক্তচক্ষু তাকে পিছনে হটাতে পারেনি। বরং যত বড় অন্যায় দেখেছেন তার কলম ততবেশী বিধ্বংসী হয়ে বর্ষণ করে গেছে। বাম সরকারের ভীতির কারণ যতটা না ওপসিশন ছিল তার ঢের বেশী ভয় পেত তারা সুশীল সমাজকে যার অন্যতম পুরোধা ছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। তাঁর লিখনীতে বাম সসরকারের পরিণতির আগাম শঙ্খ ধ্বনি বাজিয়ে লিখলেন –
” বাম-রাজত্বের শেষে আসবে বোধয় বামা-রাজ্য ”
আবার,
“অধিকার আছে তোমার রাতুল দুপায়ে
আমার গলে যাওয়া শিরদাঁড়া ছুঁড়ে ফেলবার “!
বা,
“গায়ের জোরে আমার হাবা বোনকে তুমি ধর্ষণ ক’রে গেলে
আমার অধিকার আছে তাকে মিথ্যে ব’লে প্রমাণ করবার
গুলির জোরে আমার বেকার ভাইয়ের হৃৎপিণ্ড তুমি ছিঁড়ে নিলে
আমার অধিকার আছে তোমারই কাছে দুহাত পেতে ভিক্ষে নেবার
ক্ষতিপূরণের আর প্রতিপূরণের…”

বাংলা কবিতা নতুন করে নান্দনিকতার ছাঁচে ফেলে সুনিপুন হাতে নবতর ইমারত গড়লেন তিনি। শব্দ হলো দুরন্ত হরিণ, পদ্যের ফাঁদ বিছিয়ে, বারুদের থেকে শক্তিশালী কাব্যবাণ দিয়ে সকল জরাকে, জীর্ণকে নিমিষে চুড়মার করে বাঁচতে শিখালো – সে তো শঙ্খের কবিতাই।

“শব্দ হরিণ ধরবে বলে
পদ্য মাখা ফাঁদ
দিন রাত্তির বিছিয়ে রাখে
এ’টাই অপরাধ
লোকটা সে দোষ স্বীকার করেও
সংযত নয় মোটে
সমস্তক্ষণ শব্দ সাজায়
সুখে ও সংকটে
বিষণ্ণ এই পৃথিবী ছোঁয়
জ্যোৎস্নামাখা চাঁদ
মরতে মরতে মানুষ মাখে
বাঁচার অপরাধ।
কলম যখন আঁচড় কাটে
অস্ত্র বোধ হয় ওটা
গড়িয়ে পড়ে অমৃত আর
আগুন বিষের ফোঁটা
লক্ষ হাজার অযুত ফোঁটায়
বর্ণমালার নদী
দিনযাপনের পাপগুলো সব
ভাসায় নিরবধি
তাই তো তাকে শাস্তি দিলাম”
“অজ পাড়াগাঁয় শহর মফসসলে
তুচ্ছ এখন জ্বরের আলোচনা
টিভির বাক্সে সন্ধ্যে সকাল দোলে
সংস্কৃতিময় সিরিয়ালের ফণা।
মন তো খারাপ হচ্ছে প্রতিদিনই
আমরা বরং কবিকে নিই চিনে
শব্দভেদী বান পাঠালেন যিনি
পুব পশ্চিম উত্তরে দক্ষিণে…”

কখনোবা –

“যুদ্ধারম্ভে পড়ে নেবো গীতা
আপাতত শান্তি বড় প্রিয়
বাজেটের প্রতিরক্ষাখাতে
জমা থাক নির্ভেজাল দেনা
আমি জানি তোমার লেখাতে
ঘুম ঘুম শান্তিটি মেলে না
রোজ দিন ক্লান্ত মনে দেহে
তবু তুমি আমারও বিবেক
নেতা বলে ‘শঙ্খ ঘোষ কে হে?’
আমি বলি ‘আগে বাংলা শেখ্’!”

তার আরেকটি অনবদ্য কবিতা –

“কাটআউট ভরা বিজ্ঞাপনের রাজা এবং রাণী
মুখ ঢাকা এই শহর বোঝে সমস্ত শয়তানি।

মাঝ দুপুরে শহর জুড়ে বৃষ্টি নেমেছে
রাস্তার তো ভেজার কথাই। আর কে ভিজেছে?

ভিজল হয়তো কাগজ কলম কবিতা একপাঁজা।
কবি নিজেও ভিজল বুঝি? মেজাজটাই তো রাজা।

না থাকলে সে, যমুনাবতী জন্মাতে পারতো না।
সেই তো দেবে শেষ বিকেলের বাবরকে প্রার্থনা।”

আহা কি সব সহজ শব্দে সর্বোচ্চ কঠিন প্রতিবাদ, আমার সীমিত অধ্যয়নে কাজী নজরুল ইসলামের পরে শুধু শঙ্খকেই পড়লাম যারা কলমে এত সাবলীলতায় দ্রোহ আর প্রতিবাদ রচনা করতে পেরেছেন। বিস্ময়াপন্ন না হয়ে থাকতে পারার কোন কারনই নাই যখন পড়ি –

“তোমাকে অনেক দিতে সাধ হয়, ভাঁড়ারে শব্দ নেই তাই
তোমারই বাগান থেকে তুলে আনি, যত্ন করে গাঁথি সুতো দিয়ে
চিনতে পেরেছো হয়তো, কিম্বা সেই গ্লানিমাখা শব্দ অভিলাষ
আমাকে তেমন করে ছুঁতেই পারেনি কোনওদিন
তবু শোনো ধার চাইছি, কথা দিচ্ছি যথাকালে শোধও দিয়ে দেব
বিধিমত দাবী করলে সাথে অতিরিক্ত দেব বিক্রয় কোবালা ”
বারবার মগ্নচৈতন্য নেশাতুর হবেই যে কেউ যখন শঙ্খকে পড়বে-
“আমার ধ্বংসবীজ জন্মাবধি এখানে প্রোথিত। ঠিকমত মাটি জল পেলে
চিৎকারশব্দে এক নতুন অঙ্কুরমালা জ্বলে উঠতে পারে
পাথরে শেকড় গেঁথে কথাবৃক্ষ উঠে যাবে আকাশের দিকে
এমন প্রার্থনা করলে, চেনা দুর্যোগের মত ঘুর্ণি পাঠিওনা
ঝিমধরা সময়কে চোখে চোখ হৃদয়ে হৃদয় রেখে বলতে দিও
তোমার সমস্ত নিতে সাধ হয়। ”

কবিরা অবশ্যই কল্পনা প্রবন, তবু প্রতিটি কল্পনারাজ্যের একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে। শঙ্খ হলেন সেই প্রজাতির যার সে রাজ্যপাটের সীমানার কোন শেষ নেই, সে জগতের গভীরতা অতল পর্যন্ত বিস্তৃত। যেমন-

“রাত্রির ভিতরে এসে আরো রাত্রি মিশে যায় যদি
অন্ধকার থেকে যদি জেগে ওঠে আরো অন্ধকার”

অথবা,

“কল্পনারাজইচ্ছে হলে দিনগুলোকে কচকচিয়ে মেঘ মাখিয়ে খাবো।
আঁশ থাকলে ছিবড়ে হবে। সেটুকু ঝুঁকি সবসময় থাকে।
দাঁতের ফাঁকে কবিতাকুচি খোঁচাতে হবে গোপন টুথপিকে
তবেই সেই দন্তরুচি ভদ্রভাবে প্রকাশ করা যাবে
ট্রাফিকরুল ভঙ্গকারী কঠিনতম শাস্তি পাবে জেনেও
অশ্বমেধে চলেছে তবু কবির দল দেশে ও সন্দেশে
উল্টোদিকে ডাস্টবিনের আড়াল থেকে জাতভিখিরি যারা
খাবলে খায় গায়েও মাখে গতরাতের উদবৃত্ত ব্যথা
তরকারিও সেইটুকুই দরকারি যা ভাষ্য মেনে চলে
মনোমোহন মোহনভোগ দেবার আগে রোজ দু’বার ভাবে।
কথাটা ঠিকই কবিতা নয় সুলভ যদি—
অ্যাফ্রোডিসিয়াক
অ্যাণ্টাসিড সহযোগেও। তবু কিছুটা সহজপাচ্যতা
দাবী করেছে কলমহাতে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক যুবতীরা।
কালিতে নয় —কলমে নয় –কি-বোর্ডের নকল কথকতা
ছদ্মবেশে যজ্ঞভূমি বিনা আয়াসে দখল করে আছে।
ওদের আজ প্রশ্ন কর। দখল কর কবরখানাগুলি।
দৈর্ঘ আর প্রস্থ মাপো। খুঁড়তে থাকো নিজের উচ্চতা।
সবাই যেন উঠতে পারে, নিজেই —শেষ কেয়ামতের দিনে।
প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিচারসভা সাজিয়ে রাখা আছে
সাজান আছে সওয়াল আর নিজের মত তীক্ষ্ণ যুক্তিও।
আর তা’ছাড়া সবাই জেনো লক্ষ্যভেদে ততটা পটু নয়।
মুখোশদের দাঁত থাকে না। আড়াল থেকে নিজের উদ্যোগে
ইচ্ছে হলে চিবিয়ে খাবো প্রাত্যহিক দিনযাপনগুলি
বাঁচুক শুধু ঝড়ের মত শর্তহীন কবিতা কল্পনা”

যাদের কবিতা রচনা করে দ্রোহ, করে প্রতিবাদ তারা কি প্রেম করতে জানেনা! জানে বৈকি, আমার তো মনে হয় সবচেয়ে দ্রোহী মানুষটিই এই গ্রহের সবচেয়ে বড় প্রেমিক, প্রতিবাদী মানুষটার অন্তরে থাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসা। তা নাহলে কিভাবে শঙ্খ লিখতেন-

“কিছু শব্দ কটা দিন উচ্ছলতা পায় মুখে মুখে
তার পরে মরে যায় আমরা তার শব নিয়ে ঘুরি
দুহাতে তাকেই তুমি সাজাও যে রাগে অনুরাগে
ছন্দের ভিতরে এতো অন্ধকার জেনেছ কি আগে

নির্জন সংলাপ,মুখোমুখি কিছু বিনিময়।বাকি কথা কবিতা বিষয়। ”

আবার লিখলেন-

“আমার বড়ই জ্বর। এসো তুমি। বসো এই ঘরে।
কবিতাপ্রপাত এনে ঢেলে দাও আমার শিয়রে।
ভয়ের তরাসে জ্বর। এ’ অসুখ দারুণ ছোঁয়াচে।
প্রতিবেশীরাও নাকি নিত্যদিন পোড়ে এরই আঁচে।
শরীরে কাঁপুনি ওঠে। জড়োসড়ো হয়ে থাকে মনও।
তবুও বুঝতে পারি পাণ্ডুলিপি গাঢ় আর ঘন
কুয়াশার মত ঝরছে মেলে রাখা খাতায় কাগজে
তুমি যা বলতে চাও সবই ওই বর্ণমালা বোঝে
সবুজ হলুদ লাল অস্যার্থে পুরো ভিবজিওর
রাত কিছু রঙ ঢালে, বাকি সব রঙ জানে ভোর।
পাকদণ্ডী বেয়ে উঠে আকাশে ছড়িয়ে যায় রঙ
একে কি স্বপ্ন বলব? কবিতাই বলছি বরং
বুঝি না জ্বরের ঘোরে যা দেখেছি, সবই কি কবিতা?
অসুস্থ সময়কে আরোগ্য এনে দাও পিতা।”

পৃথিবীর সবথেকে যুদ্ধবাজ শাসক, রুদ্র, রুক্ষ, কর্কশ, দুর্মর মানুষটিও প্রেমের সাগরে নিশ্চিতভাবেই উড়ে উড়ে ভাসবে, যখন পড়বেন –

“দুপুরে-রুক্ষ গাছের পাতায়
কোমলতাগুলো হারালে
তোমাকে বক্‌ব,ভীষণ বক্‌ব
আড়ালে।–

মেঘের কোমল করুণ-দুপুর
সূর্যে আঙুল বাড়ালে
তোমাকে বক্‌ব,ভীষণ বক্‌ব
আড়ালে ।”

এ অরুপ রত্নভান্ডারের গল্প পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট ফন্টে দিস্তা দিস্তা কাগজে লিখে ফেললেও কীর্তিমান শব্দসড়কের কথা হয়ত ফুরোবে না। যে জাতি যুগ যুগ ধরে উত্তরাধিকার সূত্রে কবিতার লালন পালনকারী সে জাতিতেও কবি শঙ্খ ঘোষেরা কালে ভদ্রে জন্মে।

যে আমাকে কবিতার বর্ণমালা শিখাল, যে আমায় কবিতা পড়তে শিখালো, যে আমাকে শিখাল কবিতা – সে এই শঙ্খ। সে যে আমার প্রাণের কবি, হৃদয়ে বাস করা প্রাসাদ প্রাচুর্য্য, সে বালিশের নীচে অনেক যত্নে লুকিয়ে রাখা আমার ঈদের জুতো, আামার ধীরে ধীরে আয়েসী রসাস্বাদন করা বহ্নিসখা বহ্বাশী মহাসমুদ্র, সে কবি শঙ্খ ঘোষ, সে ই আমার ছন্দের বারান্দা। রাত্রি ছিনতাই করা ঘুমশিকারী এই কবিকে ক্ষুদ্রর সর্বনিম্ন এককের ক্ষুদ্র আমি কবি বড়জোর কয়েকটি লাইন দিতে পারি। তুমি পেলে কিনা জানিনা, কখনো পাবে কিনা তাও জানতে পারবনা। তুমি পেলে কি না পেলে সে নিয়ে আমি বিন্দুস্থ চিন্তিত নই, আজ আমি দিতে পেরেই তো মহা সুখী।

আমার কবি ; শঙ্খ ঘোষ
—————- মেহেদী হাসান তামিম

শঙ্খ ঘোষ মানে নব কিছু
শঙ্খ মানেই তো ছন্দ পিছু
শঙ্খ মানেই শব্দভ্রমর
শঙ্খ মানে জীবন মুখর।

কবিতারা কথা বলা বাগ্মীনদী, লিখে শঙ্খ যদি
পেখম বিছায় বর্ণ যত শব্দে করে ভর
বাক্যকণ্ঠে তাল, শব্দ তরী, লাইনগুলো যে জ্যান্ত ছবি,
অন্যায় বিরুধে কবিতাই অস্ত্র সবি, শঙ্খ হলে কবি।

২৬/৯/১৭
(অক্ষরবৃত্ত)

আমার দ্রোহ, আমার প্রেম

শেয়ার করুন
আপডেট : অক্টোবর ৩০, ২০১৭ — ১২:২৭ পূর্বাহ্ন

মন্তব্য করুন

Muktokolom © 2017 রুদ্র আমিন