Muktokolom

কলমের স্পর্শে শুদ্ধ হোক পৃথিবী

বাংলা সাহিত্যের সার্থক ছোটগল্পের গল্প

ছোটগল্পে’র ছোট ছোট গল্প
———————-মেহেদী হাসান তামিম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দীর্ঘ অবসরময় বর্ষায় কি করে কাটাবেন তা ভাবতে গিয়ে লিখে ফেললেন একটি দীর্ঘ কবিতা-’বর্ষাযাপন’। ’সোনার তরী’ কাব্যের এ কবিতায়, বিশ্বকবি বর্ষার হৃদয় আকুল করা ঝুম বৃষ্টিধারার মধ্যে কলকাতা শহরের বুকে ঘরবন্দী হয়ে সময় পার করতে বিভিন্ন কাজ করে নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন। জানালা পথে পাশের দালানগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন, বিজলী চমক, বৃষ্টি-পতন দেখে আকাশ পাতাল চিন্তা করছেন, নি:সঙ্গতা কাটাবার জন্য খুলে বসেছেন কালিদাসের ’মেঘদূত’, গোবিন্দদাসের ‘পদাবলী’ খুলে পড়ছেন ‘বর্ষা অভিসার’- নিমজ্জিত হতে চাইছে মন, মিলিয়ে যেতে চাইছেন সঙ্গীবিনা একাকী রাধার নীলচে বেদনার রঙে। কিন্তু কিছুতেই শান্ত হতে চায়না যে মন। একে বর্ষার রিনিকঝিনিক ধারা, তার উপরে একাকী সিনড্রোম। তাই তিনি রচিলেন –

”ছোটো প্রাণ,ছোটো ব্যথা ছোটো ছোটো দু:খকথা
নিতান্তই সহজ সরল,
সহস্ত্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দু-চারিটি অশ্রুজল।
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।
অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি’ মনে হবে,
শেষ হয়ে হইল না শেষ।
জগতের শত শত অসমাপ্ত কথা যত,
অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল,
অজ্ঞাত জীবনগুলা, অখ্যাত কীর্তির ধুলা,
কত ভাব, কত ভয় ভুল-
সংসারের দশদিশি ঝরিতেছে অহর্নিশি
ঝরঝর বরষার মতো-
ক্ষণ-অশ্রু ক্ষণ-হাসি পড়িতেছে রাশি রাশি
শব্দ তার শুনি অবিরত।
সেই-সব হেলাফেলা, নিমেষের লীলাখেলা
চারিদিকে করি স্তূপাকার,
তাই দিয়ে করি সৃষ্টি একটি বিস্মৃতিবৃষ্টি
জীবনের শ্রাবণনিশার।”

একেবারে আমাদের মতো নিতান্ত সাধারণ যারা, তাদেরকে একাকীত্ব রোগে ধরলে দু-চার লাইনের প্রেমের কবিতা রুমঝুম ঝুমঝুমে কলম থেকে ঝড়তে চায়, সেখানে রবিকবি তো প্রেমরাজ্যের মহারাজা, প্রেমিক পুরুষদের এক বিসৃত আদর্শ আর প্রেমিকাদের হৃদয়ের মনিকোঠায় বাস করা সব থেকে সহৃদয় সুপুরুষ। তাই এরকম অবস্থায় তাঁর কলমের আঁচড়ে বাংলা সাহিত্যের অমৃতসুধা মথিত হবে সেতো খুব সহজেই অনুমেয়। তাঁর লিখিত উপরের এই পদমালাকে সাহিত্যে ছোট গল্পের পুর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা বলা হয়। এই ‘বর্ষাযাপন’ কবিতাকে শুধুমাত্র ছোটগল্পের সংজ্ঞায়নে সীমায়িত করলে এর ব্যাপকতাকে অসম্মান করা হয়।এ তো শুধু সংজ্ঞা নয়, এ হলো ছোটগল্পের মূল রহস্য, রচনাকৌশল আর পুর্ণাঙ্গ মধুরতম রুপমাধুরী।

ইতিহাস হাতড়িয়ে যা পাওয়া যায় সকল সাহিত্য মাধ্যমের মধ্যে প্রাচীনতম ও কঠিনতম মাধ্যম হল কবিতা। ছোটগল্পের অবস্থান ঠিক তার পরেই অথবা তারা দু’জন সহোদরপ্রতিম বলা যায়। কবিতা কি – এটা যেমন সহজে বলা খুব সহজ কাজ নয়, তেমনি ছোটগল্প কাকে বলে সেটা বলাটাও সমান জটিল কর্ম। উপরে ছোটগল্প নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে পদাবলি তা নিশ্চিতভাবে ছোটগল্পকে দিয়েছে সহজবোধ্যতা, এবং সোয়া শত বছর পরের লেখকদেরকে সেদিনের থেকেও আরো সহজভাবে ছোটগল্পকে রুপশ্রী দেবার আবশ্যিক উপাদান ও উপকরণসমূহ। তিনি সেদিন চারদেয়ালে বন্দি থেকে যা ভেবেছিলেন আজ এই মুহূর্তেও তা সর্বাধিক আধুনিক।

আর কেতাদুরস্ত কেতাবি ভাষায় এর সংজ্ঞায় মোটামুটিভাবে যা পাওয়া যায় –
এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকাতে – ’ brief fictional prose narrative that is shorter than a novel and that usually deals with only a few characters.’

ছোটগল্পের আরেক অন্যতম কারিগর এডগার এলান পো এর মতে- ’a short story should be read in one sitting, anywhere from a half hour to two hours.’

সকল ক্ষারক ক্ষার কিন্তু সকল কর ক্ষারক নয় যেমন, তেমনি সব ছোটগল্পই গল্প বটে কিন্তু সব গল্পই ছোটগল্প নয়। একটি কাহিনী বা গল্পকে ছোটগল্পে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য কিছু নান্দনিকতা ও শিল্পশর্তের সেতু দিয়ে ভ্রমন করতে হয়। বাংলা গদ্য কবিগুরুকে নিজ হাতে গড়তে হয়েছে। ভাষা সেভাবে ছিলনা, পর্বে পর্বে স্তরে স্তরে ভাঙতে এবং গড়তে হয়েছে তাঁকে। গদ্যের ভাষা তৈরী করতে হয়েছে গল্পপ্রবাহের সাথে তাল মিলিয়ে। মোপাসাঁর মত বিদেশী লেখকরা তৈরী ভাষা পেয়েছিলেন, লিখতে লিখতে ভাষা গড়তে হয়নি তাঁদের।
তরুণ লেখকদের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
‘ভেবে দেখলে বুঝতে পারবে আমি যে ছোট ছোট গল্পগুলি লিখেছি, বাঙ্গালী সমাজের বাস্তবজীবনের ছবি তাতেই প্রথম ধরা পড়ে। বঙ্কিম যে ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘কপালকুন্ডলা’ লিখেছিলেন, সে সব কি সত্যি ছিল?’ তবে তিনি একথার মাধ্যমে বঙ্কিমের সমালোচনা নয় বরং প্রশংসাই করেছিলেন। তিনি বলেছেন, বঙ্কিমের রচনায় যা পাওয়া যায় তা সামন্ততন্ত্র নয়, তাকে একটা নতুন পিপাসা বলে যেতে পারে। এ স্বাদ আমরা আগে কখনো পাইনি। নিন্দে করতে পারব না বঙ্কিমকে, নিশ্চয়ই বলব তিনি ও রসের যোগান দিয়েছিলেন বলেই বেঁচে গিয়েছিলুম।

ছোট ছোট দুঃখকথা থাকবে, নিতান্তই সহজ-সরল হবে অর্থাৎ খুব বেশি বাগাড়ম্বর থাকবে না, আর শৈলীর নামে শৈলী নির্ভরতাটা থাকবে না। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিজেই এটার একটা প্রমাণ যে ছোটগল্প হচ্ছে এরকম। গত শতকের তিনের দশকে বাংলা সাহিত্যে ‘গরিবিয়ানা’ দেখাবার বেশ একটা হুজুগ পড়ে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ সেই আমলের তরুণদের এই হুজুগকে সমর্থন করতে পারেননি। সাহিত্য সমালোচনার আসরহগুলোতে তরুণ লেখকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেতেন –
“অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করে কেউ লিখতে পারে না। তোমরা বলতে পার, দরিদ্রের মনোবৃত্তি আমি বুঝি না, এ কথা মেনে নিতে আমার আপত্তি নেই। তোমরা যদি বল, তোমাদের সাহিত্যের বিশেষত্ব দারিদ্র্যের অনুভূতি, আমি বলব সেটা গৌণ।…… আমরা অর্থশাস্ত্র শেখবার জন্য গল্প পড়ি না। গল্পের জন্য গল্প পড়ি। তোমরা ‘গরিবিয়ানা’ ‘দরিদ্রিয়ানা’কে সাহিত্যের অলংকার করে তুলোনা। ভঙ্গি মাত্রেরই অসুবিধা এই যে, অতি সহজেই তার অনুকরণ করা যায়— অল্পবুদ্ধি লেখকের সেটা আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। যখন তোমাদের লেখা পড়ব তখন এই বলে পড়ব না যে, এইবার গরিবের কথা পড়া যাক। …. .. প্রত্যেকের নিজের ভিতর অভিমান থাকা উচিত যে, আমি যা লিখছি ‘গরিবিয়ানা’ বা ‘যুগ’ প্রচার করবার জন্য নয়, একমাত্র আমি যেটা বলতে পারি সেটাই আমি লিখছি।”

‘সাহিত্যের পথে’ আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ বাস্তবকে বিস্তৃততর করেছেন এইভাবে,
“রামায়ণ মহাভারত দেশের সকল লোকে পড়ে তাহার কারণ এ নয় যে, তাহা কৃষাণের ভাষায় লেখা বা তাহাতে দুঃখী-কাঙালের ঘরকান্নার কথা বর্ণিত। তাহাতে বড়ো বড়ো রাজা, বড়ো বড়ো রাক্ষস, বড়ো বড়ো বীর এবং বড়ো বড়ো বানরের বড়ো বড়ো লেজের কথাই আছে। আগাগোড়া সমস্তই অসাধারণ। সাধারণ লোক আপনার গরজে এই সাহিত্যকে পড়িতে শিখিয়াছে“।

রবীন্দ্রনাথের আশ্চর্য-সুন্দর গল্পগুলির মধ্যে কোমলতা দুর্বলতাময়, সকরুণ আশঙ্কা ভরা অপরিণত বেশ আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত দেে চলা কিছু মানুষের পুর্ণাঙ্গ চরিত উঠে এসেছে। এদের প্রেক্ষাপট অতিমাত্রায় বাস্তব, তারপরেই তাদের আচার আচরণ, চিন্তা ভাবনায় এমন দ্যুতি দেখা যায় যা তাদের চেনা প্রেক্ষিত থেকে তুলে এনে চিরকালের সাহিত্যে জায়গা করে দিয়েছেন। বিষয়ের ভার খসে খসে পড়েছে তাঁর এক একটি ছোটগল্পে। গল্প আঘাত করেছে অথবা দখল করেছে পাঠকের মনোজগতেকে। প্রতিভাবান গল্পলেখকের অনবদ্য গঠনশৈলী, ভাষা ব্যবহারে বিরল দক্ষতা ও সচেতনতা না থাকলে এটি কিছুতেই সম্ভব হত না।
বিশ্বসাহিত্যে ছোটগল্প তুলনামূলক নবীনতম শাখা। বাংলা সাহিত্যে প্রকৃত অর্থে ছোটগল্পের জন্ম রবীন্দ্রনাথের হাতেই। শুধু জন্মই নয়, তার উজ্জ্বল বিকাশ ও সর্বাঙ্গসুন্দর পরিণতিটাও তাঁর কলমেই। তাঁর আগে গল্পের নামে যা লেখা হয়েছিল তা রাজারাজড়ার বিচিত্র ঘটনাবিশিষ্ট আখ্যানমালা। সাহিত্য সমাজের কিছু সমালোচক রবীন্দ্রনাথের মধ্যে একজন বুর্জোয়া লেখককে আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন । একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা হয়েছিল বারবার। বলা হয়েছিল তিনি মাটির কাছাকাছি নন।
কথাগুলি একেবারেই ভুল। আসলে চারপাশের বাস্তবতা থেকে শিল্পসম্মত উত্তরণকে ওই সব সমালোচক ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। সম্পূর্ণ ভাবে দেখতে গেলে কিছুটা দূরত্বও সৃজন করতে হয়। রবীন্দ্রনাথ তা করেছিলেন। লেখকের তৈরী ওই দূরত্ব গল্পগুলিকে বাস্তবের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক ওপরে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে প্রতিটি সময়।
প্রকৃতি ও মানুষের কাছ থেকে যতটুকু যা গ্রহণ করার ততটুকুই গ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাকিটুকু শিল্পবোধের ব্যাঞ্জনা- যা পাঠকহৃদয় ও অনুভূতির জগতকে আলোড়িত করে সবিশেষ অবস্থান ও কাল থেকে বহু দূরে নিয়ে এসেছে। আজ তাই, একুশ শতকের গোড়াতেও, তাঁর বেশ কিছু গল্প সর্বাংশে আধুনিক তা স্বীকার না করে উপায় নেই।

গল্পগুচ্ছ নামীয় গ্রন্থে সংকলিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে সকল ছোটগল্প সংকলিত সেগুলো বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প হিসাবে অদ্যাবধি চিহ্নিত এবং বহুল পঠিত। বাংলা ছোটগল্পের সার্থক স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ‘ঘাটের কথা’ ছোটগল্পটি বাংলাভাষার প্রথম সার্থক ছোটগল্পের স্বীকৃতি পেয়েছে। অতঃপর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বনফুল, (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়), বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, আশাপূর্ণা দেবী, জগদীশ গুপ্ত জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, মনোজ বসু প্রমুখের রচনানৈপুণ্যে বাংলা ছোটগল্প নতুন দিগন্তে প্রবেশ করেছে।
মুখে মুখে গল্প বলার ইতিহাস কবে শুরু হলো তা বলাই মুশকিল।মা কিংবা দাদা-দাদীর মুখে গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়ার গল্পটাও কিংবদন্তী হয়ে গেছে। ঈশপের গল্প বা জাতকের গল্প খ্রীস্টের জন্মেরও অনেক আগে লেখা। তবে সবার আগে গল্পে হাত পাকিয়েছেন মিশরীয়রা। ধর্মীয় বিষয় কাব্যে থাকলেও প্যাপিরাসে লেখা বাকী সব কিছুই ছিলো গদ্যে। অর্থাৎ তারাই প্রাচীনতম গদ্যের অধিকারী। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রাচীনতম মিশরীয় গল্পসঙ্কলনের নাম ‘The Shipwrecked Sailor’ (জাহাজডোবা নাবিক), যা খ্রীস্টপূর্ব ২০০০ সালে রচিত বলে ধারনা করা হয়।

আব্বাসীয় যুগের আরব্য রজনীর গল্প ধারাবাহিক গল্পবলার ধ্রুপদী নিদর্শন। পারস্যের অনুদিত গল্প তোতা কাহিনী কিংবা ঠাকুর মা’র ঝুলি আমাদের গল্পের ইতিহাসের স্বর্ণ-সম্ভার। মুখে মুখে প্রচলিত গল্পগুলোই হোমারের ’ইলিয়াড’ আর ’ওডিসী’র মতো মহাকাব্যে রূপ পেয়েছে। শেক্সপীয়রের নাটকের উপকরণও জুটেছে মুখে মুখে প্রচলিত গল্প থেকে।

ছোটগল্পের জন্ম এ সব গল্পের ধারনা থেকে, সেটা বলাই বাহুল্য। আজকের ছোটগল্পের পূর্বপুরুষ বিবেচনা করা হয় চতুর্দশ শতকের ইংরেজ লেখক জিওফ্রে চসারের ’কেন্টারবারী টেলস’ আর রোমান লেখক বোকাচ্চিওর ’ডেকামেরন’কে। দুটোই পৃথকভাবে লেখা ছোট ছোট গল্পের সমাহার। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি ফরাসী সাহিত্যে ছোট আকারের উপন্যাস ’নভেলা’ আবির্ভূত হয়। এরপরই ইউরোপীয় গল্প জগতে বিপ্লব নিয়ে আসে ইউরোপীয় ভাষায় ’আরব্যরজনী’র অনুবাদ। বেশিরভাগ গুনীর মতে এখান থেকেই ছোটগল্পের বর্তমান ধারনার সূত্রপাত। অষ্টাদশ শতকে ভলতেয়ারসহ অন্যান্য ইউরোপীয় লেখকের লেখায় আরব্যরজনীর সুস্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়।

এঁদের পর আসেন ছোটগল্পের যাদুকরদের একজন, অঁরি রেনি আলবেয়র গী দ্য মোপাশা। তাঁর লেখা ’নেকলেস’ (ডায়মন্ড নেকলেস), বোল দা সৌপ (চর্বির বল), ইন দা স্প্রিং , এন ওল্ড ম্যান, রাস্ট, টু ফ্রেন্ডস, কনজারভেটরী, দা ম্যাটার উইথ আন্দ্রে ইত্যাদি গল্প অবিস্মরণীয়। একই সময় রাশিয়ায় গল্পের পশরা সাজান ইভান তুর্গেনেভ, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, লিও টলস্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কি এবং ছোটগল্পের আরেক শীর্ষ দিকপাল আন্তন চেখভ।

গত শতকের প্রথমার্ধে গল্প লিখেছেন হেক্টর হিউ মুনরো (সাকী), উইলিয়াম সমারসেট মম, ভার্জিনিয়া উলফ, গ্রাহাম গ্রীন, আর্থার সি. কার্ক, জেমস জয়েস, নোবেল বিজয়ী লেখক উইলিয়াম ফকনার, আরেক নোবেল বিজয়ী আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর দিকপাল আইজাক আসিমভ, নোবেলজয়ী জার্মান লেখক টমাস মান, ফ্রান্স কাফকা প্রমুখ। গত শতকের শেষার্ধে ছোটগল্পচর্চা করেছেন নোবেলজয়ী লেখক জন স্টেইনবেক, ফিলিপ রথ, জেমস বল্ডউইন, স্টিফেন কিং, ইতালো ক্যালভিনো, নোবেল বিজয়ী পর্তুগীজ লেখক হোসে সারামাগো, জর্জ লুই বোর্গেস, জুলিও কোর্তাসার, নোবেল বিজয়ী লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, পেরুর নোবেল জয়ী লেখক মারিও ভার্গাস ইয়োসা, নোবেল জয়ী মিসরীয় লেখক নাগিব মাহফুজ, তিন জাপানী লেখক-নোবেল জয়ী কেনজাবুরো ওয়ে, ইয়োকি মিশিমা এবং সম্ভাব্য নোবেল জয়ী বলে কয়েক বছর ধরে আলোচিত হারুকি মুরাকামি। সমকালীন ছোটগল্পের ’মাস্টার’ হিসাবে পরিচিত কানাডীয় লেখিকা এলিস মুনরো এ বছর (২০১৩) ছোটগল্পের জন্য নোবেল পুরস্কার জিতেছেন।

সুদূর আমেরিকায় লেখক আর্নেস্ট হোমিংওয়ে নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট গল্পটি লিখেছিলেন।
হোমিংওয়ের গল্পটি ছিল এমনঃ “For sale. Baby shoes. Never worn. গল্পটির বাংলা অনুবাদ : “বিক্রি হবে। বাচ্চাদের জুতো। কখনোই ব্যবহৃত হয়নি।”
যার ব্যাখ্যাটা এরকম: একটা বাচ্চার জন্য জুতো কেনা হয়েছিল, কিন্তু সেই বাচ্চাটা পৃথিবীর আলোই দেখেনি। আর এই ৬ শব্দে গর্ভে মারা যাওয়া শিশুর জন্য মায়ের অনুভূতি তিনি এই কয়েকটিমাত্র শব্দ দিয়েই প্রকাশ করেছেন।

এরকম আরেকটি গল্প ফ্রেডরিক ব্রাউনের নক (knock) গল্প। মাত্র দুই বাক্যের এই গল্পকে অনেকেই বলেন ভূতের গল্প। তিনি লিখেছিলেনঃ “The last man on Earth sat alone in a room. There was a knock on the door…” গল্পটির বাংলা অনুবাদ : “পৃথিবীর সর্বশেষ মানুষটি একাকী একটা রুমে বসে আছেন। হঠাৎ কে যেন তার দরজায় নক করল…।” ভাবুন পৃথিবীর সর্বশেষ জীবিত মানুষটি একা একটা ঘরে বসে আছেন। কেউ একজন দরজায় নক করল। তবে কে করল?

বাংলায় অনুদিত ’পঞ্চতন্ত্র’, ’জাতকের গল্প’, ’তোতা কাহিনী’ ও ’আরব্যরজনীর গল্পে’র উত্তরাধিকার আর ’ঠাকুর মার ঝুলি’র সোনালী অতীত নিয়ে বাংলা ছোটগল্পের ঘরগেরস্থালী অনেক সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পকার হিসাবে বিশ্বের সেরাদের এক জন। বাংলা ছোটগল্পের কারিগরদের মধ্যে প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শওকত ওসমান, জসীম উদদীন, সৈয়দ মুজতবা আলী, আবু রুশদ, সৈয়দ ওয়ালীউলাহ, বনফুল, আউদ্দিন আল আজাদ, জহীর রায়হান, আবু ইসহাক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আল মাহমুদ, বেগম রোকেয়া, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল মনসুর আহমদ, শাহেদ আলী উলেখযোগ্য।

ব্যতিক্রম বনফুল। তাঁর বেশিরভাগ গল্প ছোট আকারের। ’নিমগাছ’ বা ’বিধাতা’র মতো বিখ্যাত গল্প এক পৃষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ। সমাজ চেতনা, রাজনীতি সচেতনতা, নিরীক্ষাধর্মিতা সাম্প্রতিক ছোটগল্পে লক্ষ করা যায়।

কিভাবে গল্প লেখা যায় এ প্রশ্নের জবাব দেয়া অসম্ভব কাজ। কারণ প্রকৃত সৃজনশীলতার কোন ম্যানুয়াল হয় না। কারণ প্রকৃত শিল্পীর প্রতিটি কাজই মৌলিক। কারো সাথে সেটা মিলবে না। যেটা করা সম্ভব সেটা হচ্ছে আরেকজনের অভিজ্ঞতার কথা জানা। কারণ অভিজ্ঞতা খুবই মূল্যবান। প্রায়ই সেটা কেমন করে যেন কাজে লেগে যায়।

জ্ঞান আর সৃজনশীলতার জগতে গুরুর কাছে শিক্ষা নেবার কিছু নজীর আমরা পাই। ফ্লবেয়রের কাছে মোপাশার লিখতে শিখার কথা আমরা সবাই জানি। সে শিক্ষা আর আপন প্রতিভাবলে মোপাশা হয়ে উঠেছেন ফরাসী সাহিত্যের সবচেয়ে নিপুন গদ্য লেখক। গান বাজনার কথা না হয় তুললাম না। আরেকটা খবরও আমাদের জানা আছে, সেটা হচ্ছে অভিজ্ঞতা বিনিময়। ফলে বিভিন্ন জনের মতের মিলের ভেতর দিয়ে শিল্পে সাহিত্যে নানা আন্দোলন দানা বেঁধেছিলো। যেমন- ইম্প্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম, সুররিয়ালিজম, কাঠামোবাদ, উত্তর কাঠামোবাদ, বিনির্মানবাদ ইত্যাদি।

রেফারেন্স:

১। উইকিপিডিয়া।
২। মার্জিনে মন্তব্য গল্পের কলকব্জা– সৈয়দ শামসুল হক
৩। এনসাইকোপিডিয়া ব্রিটানিকা
৪।বাংলাদেশের ছোটগল্প:উত্তরাধিকারের প্রেতি: আহমাদ মোস্তফা কামাল
৫।How to Write a Short Story- Etd.by Acebrock, Ben Rubenstein & Others

ছবি: অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।

শেয়ার করুন
আপডেট : অক্টোবর ৩০, ২০১৭ — ১:০৩ পূর্বাহ্ন

মন্তব্য করুন

Muktokolom © 2017 রুদ্র আমিন