Muktokolom

কলমের স্পর্শে শুদ্ধ হোক পৃথিবী

রাফা’র সাপ্তাহিক নির্বাচিত পোস্ট (০৭/১০/২০১৭ থেকে ১৩/১০/২০১৭)

প্রিয় সুধী, কলমের স্পর্শে শুদ্ধ হোক পৃথিবী এই স্লোগানকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলছে রাইটার্স ফাউন্ডেশন(রাফা)। লেখকদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি আমরা। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা প্রতি সপ্তাহে কিছু লেখা নির্বাচন করে থাকি। এখান থেকে মাসিক সেরা লেখক নির্বাচন করা হয় যাকে রাফা পুরষ্কৃত করে থাকে।
এই সপ্তাহে এতই লেখা জমা পড়েছে যে আমাদের অভিজ্ঞ নির্বাচকমন্ডলী অত্যন্ত পরিশ্রম করে নিচের লেখাগুলোকে সেরা নির্বাচন করেছেন ।

★কোত্থাও কোন প্রেম নেই
–মাহমুদ হাসান অয়ন

কোত্থাও কোন প্রেম নেই
আদিতে, অন্তে, দরোজা আটা চারদেয়ালের সম্পর্কের ভেতর,
তিন তিনবার কবুল বলা কপোত-কপোতীর প্রতিজ্ঞার ভেতর,
শাখা, সিঁদুর, শুভদৃষ্টি , যত্ন করে সাতপাকে বাঁধার ভেতর-
কোত্থাও কোন প্রেম নেই।
মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম নেই,
জননীর প্রতি জনকের প্রেম নেই,
জনতার প্রতি রাষ্ট্রের প্রেম নেই,
শোষিতের প্রতি শাসকের প্রেম নেই,
ফসলের প্রতি বৃষ্টির প্রেম নেই,
স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির প্রেম নেই,
তসলিমা’র প্রতি রুদ্রের কিংবা রুদ্রে’র প্রতি তসলিমারও, কোন প্রেম নেই
কোত্থাও কোন প্রেম নেই।

এত যে মানুষ হৈ-হুল্লোড়ে খুঁজে ফেরে জীবনের নানামুখী মানে;
কারো টাকা চাই, কারো ক্ষমতা চাই, কারো সাধ করে শতবার ঠোঁট চুমু আঁকা চাই।
আবার কারো কারো মদিরার পেয়ালায় চাঁদমুখী বাঈজী চাই,
আকাশ সমান আদিম আকাঙ্খায় কারো কারো পরস্ত্রীর লোভনীয় শরীর চাই;
কতই তো দেখি এমন, কই ওতে তো কোন প্রেম দেখি না,
কোন প্রেমিকও দেখি না তেমন।

কোত্থাও কোন প্রেম নেই,
অফিস, রেস্তোরা, বাসস্ট্যান্ড, ঘুপচি গলি, শরীর এলানো পার্কের বেঞ্চি, হুডতোলা রিক্সার সুরক্ষিত কামরা, বন্ধুবরের অনুরোধের ফ্ল্যাট-
কোত্থাও কোন প্রেম দেখি না আজকাল।

শাহাবাগ, পরীবাগ, হাতিরঝিল, ধানমন্ডি লেক, চন্দ্রীমা উদ্যান, সংসদ ভবনের যুগল অভয়ারণ্য;
কিংবা তোমার আমার নিরুত্তর অভিমানের একশো বত্রিশ টা প্রহর-
কোত্থাও কোন প্রেম দেখি নি কোনদিন।

কোত্থাও কোন প্রেম নেই।
আসামীর প্রতি বিচারকের প্রেম নেই,
রোগীর প্রতি ডাক্তারের প্রেম নেই,
ভাঙার প্রতি গড়ার প্রেম নেই,
সততার প্রতি দুর্নীতির প্রেম নেই,
ধর্ষিতার প্রতি ধর্ষকের প্রেম নেই,
এবং
তোমার প্রতি আমার
কিংবা আমার প্রতি তোমার-
সেখানেও কোন প্রেম নেই;
কোত্থাও কোন প্রেম নেই।

এত নেই এর ভেতর,
কোন কোন শুক্লাদ্বাদশীর দ্বিতীয় পক্ষে
একমুঠো বিশুদ্ধ প্রেমের লোভে
বুকের ভেতর এক আকাশ বেপরোয়া শূণ্যতা কেবলি হাতুড়ি পেটাতে থাকলে-
আমি প্রত্যেকবার ডিঙি ভাসিয়েছি চাড়ালকাটার অথৈ নীল জলে।
উত্তরে জোয়ার, দক্ষিণে জোয়ার
সিথানে জোয়ার, পৈথানে জোয়ার
জোয়ারে জোয়ারে টালমাটাল নদী, নাবিক এবং প্রেমের নৌকোখানি;
কিন্তু সেখানেও কোন প্রেম দেখি নি আমি!
অতঃপর পাহাড়ের কাছে গিয়েছি, ঝর্ণার কাছে গিয়েছি
রাষ্ট্রের কাছে গিয়েছি, শাসকশ্রেণির কাছে গিয়েছি
নতজানু প্রেমিকের মতন আপাদমস্তক, অক্লান্ত কঁড়া নেড়েই গ্যাছি-
দোপেয়ে কোন রাজলক্ষ্মীর বদ্ধ দুয়ারে।
কিন্তু কোত্থাও একটু সুখের আশ্রয়, একটু স্বনির্ভরতার প্রশ্রয়
একটু নরম মখমলের মত প্রেম-
শৈল্পিক উষ্ণতায় কখনো বাঁধে নি আমায়।

কোত্থাও কোন প্রেম ছিল না,
কোত্থাও কোন প্রেম দেখি নি, কোনদিন!
——————

★ পেরেমের কেউ মরেনারে, মরে অবিশ্বাসে
–সাবিনা ইয়াসমিন

মন ছুঁইবার চাও? মন পাইবা কই?
হেতো কৃষ্ণপক্ষের চাঁন!আন্ধারে জোনাকি!

মন দিয়া তোমার কি কারবার?
তুমি বড় ব্যাপারী, ব্যাপার করো দেহ লইয়া
মনের খোঁজ কি দরকার?

দেহ লও, দেহ বেঁচো,
দেহের মাঝে শুঁয়োপোকা, ঘূণপোকা আর ও কত কি!
বড় লাভ বইবো! লইয়া যাও।

মন খুঁজতে আর আই ও না,
চক্ষু দুইহান পুঁইড়া যাইবো
আমি আমারে লইয়া আছি
আমর নাকফুল, লতা- ফাতা, কাজলাদিঘী – পদ্মপাতা!

আমারে ঘাটাইও না, যা করছি- করছি!
হের লাইগা হারা জীবন অনলে জ্বলমু?

কি কইলা? চোক্ষু কান্দে!
যেই দিন মন কাঁনবো হেই দিন আইও
চোক তো হগলেরই কান্দে!
মন কান্দে কয়জনের!

মইরা যাইবা?
অত সোজা!
পিরীতের মরা কয় জন মরে?
মরার আগে পেরেম শিখো
দেখবা হারা জীবন বাইচ্চা থাকপা চোক্ষের জলে।

পেরেম চাও?
নিজেরে চিনো – কইলজ্জারে জিগাও
কার লাইগ্গা ধরফরাও?

কেমন্মে থাকমু?
পারমু !পারমু ! খুব পারমু।

হগ্গলেই কয় মাইরা যামু
চোক্ষের জলে ভাইষা- ডুইব্বা ঠিকই একদিন বাইচ্চা থাহে।
——————

★ একটা স্লোগানের জন্য
–রতন সেনগুপ্ত

সব স্লোগান নটঙ্কী
আমরা কোথায় দাঁড়াব একটা স্লোগানের জন্য
যে উচ্চারণে শুদ্ধ হবে বুকের ভেতর উথাল-পাথাল
কবিতা উপহার যাবে, নেবে জন্মান্তর

আমাদের বেচে যাদের সুখ, যাদের জয়
জয়গান তারাই গায় – আমরা পার্শ্ব চরিত্র আর ভয়
ছেঁড়া জামা, নগ্ন পা বেচে থাক
নাহলে হতাশ হবে সমাজ, ভিক্ষাদানে পুণ্য বাড়ে বড়

আমাদের ভর্তুকি জীবন
কে জানে কে কাকে ভর্তুকি দেয়
আমরা হাত পাতি, এ তাদের বড় সম্পদ

হাত আছে, ন্যায্যতা নেই, কাজ আছে –
কাজও ভিক্ষা হয়ে বাড়ন্ত সমাচার

সব স্লোগান নটঙ্কী
সময় বয়ে গেলে কড় গুনে দেখি
কতকাল আমাদের অপেক্ষা
একটা স্লোগানের জন্য।
——————

★ ঈশ্বর ও ডাক্তার
–রাসেল মোরশেদ

মানুষ ঈশ্বরকে ঈশ্বর বলে ডাকে
অথচ ঈশ্বরকে ডাক্তারের অধীনে করে ফেলে;
তা কি তাঁদেরই অজানায়?
আমি বুঝতে পারি না।

এই মানসিকতা তৈরি করছে একদল শিক্ষিত ডাকাত,
যারা সেবা বুঝে না, বুঝে টাকা; আছে ভূয়া সার্টিফিকেট।
আমি মানতে পারি না,
তবে ডাক্তার বিদ্বেষী নই,আমি নই পরিপন্থী।

যে মানুষ বলে ঈশ্বরের উপর ভরসা রাখি
অথচ দেখি ডাক্তারী সব!এ ভাবনা থেকে মুক্ত নয়।
ঈশ্বর ডাক্তারের ডাক্তার ; সেই সত্য অমান্যয়।

ঈশ্বর পবিত্র যুক্তিহীনে মান্য
অথচ ডাক্তারের বাড়িতে গেলে মনে হয় তা অগণ্য।
ডাক্তার হয় ঈশ্বর ; অদ্ভুত ব্যাপার!
মিনিট পাঁচেকে কষায় টাকা রাখতে ডাক্তার বাবুর আবদার।

হে উন্মাদ জানো না,দিন শেষে ডাক্তারো অসহায়
পারে না মিলাতে হিসাব; খুঁজে ঈশ্বরের সহায়।

অতএব, ঈশ্বরই পরম ডাক্তার মেনে নাও চোখবুজে
ডাক্তারের পিছনে না দৌড়ে; নাও তাঁরে খুঁজে।
——————

★ ছোটগল্প (জলপরী)
—shreejita bera

ডাইনিং টেবিলে খেতে বসে সামনের ইনকমপ্লিট নৈসর্গিক দৃশ্যটার অ্যানাটমিতে চোখ পড়ল নিধির । একটা শ‍্যাওলা রঙের জল-টলমল পুকুর ।তার শান বাঁধানো ঘাট । পুকুর পাড়ে সবুজের হোরিখেলা । মাসখানেক হল রাজারহাটের এই নতুন ফ্ল্যাটটাতে দিন যাপন শুরু হয়েছে নিধি আর রোমিতের । আস্তে আস্তে নিজেদের টেস্ট অনুযায়ী ফ্ল্যাটটাকে সাজাচ্ছে দুজনে । ড্রয়িং কাম ডাইনিং-এর এই ওয়াল পেন্টিংটা নিধিরই রং-তুলি জাত । তুলির টানে পুকুর পাড়ে এক জলপরীরর অবয়ব ফুটিয়ে তোলার ইচ্ছা আছে। তার অয়েল কালারের ভাঁড়ার আপাতত শূন্য । অফিস যাওয়ার আগে রোমিতকে অয়েল কালার আনার কথা মনে করিয়ে দিতে হত । কিন্তু আজ সকাল সকাল রোমিতের বৃদ্ধ বাবা-মা মানে নিধির শ্বশুর-শাশুড়িকে তাদের নতুন ফ্ল্যাটে নিয়ে আসার ইস‍্যুতে রোমিতের সাথে বিবাদ বাধায় ,অয়েল কালারের কথা রোমিতকে বলতে একদম ভুলে গেছে । রিসেন্টলি একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি পেয়েছে নিধি। কদিন পরই সেখানে জয়েন করবে । এমতাবস্থায় রোমিতের বাবা-মাকে এই ফ্ল্যাটে এনে রাখলে তার কাজের চাপ বাড়বে বই কমবে না । সেই নিয়েই ঝামেলা হয় দুজনের মধ্যে ।

ভোরের দিকটায় নিধির ঘুমের বাঁধন শিথিল হল। মুঠোফোনের লক খুলতেই নীলচে স্ক্রিনে চকচক করে উঠল তিনটে সংখ্যা চার , শূন্য আর পাঁচ । জল খাওয়ার জন্য ডাইনিং-এ এসে ফ্লুরোসেন্ট বাতিটা জ্বালাতেই দেখল ,এক অষ্টাদশী পল্লীবালা দাঁড়িয়ে , তার পরনের মাস্টার্ড ইয়োলো জমিতে কালো চেকচেক । অবিকল নিধির ওয়াল পেন্টিংটার মত । সঙ্গে সঙ্গে সামনের দেওয়ালের দিকে তাকাল । আজ দুপুরেই রং-তুলিতে ভর করে হলুদ-কালো চেকচেক শাড়ি পরা এক জলপরীকে পুকুর-ঘাটে দাঁড় করিয়েছিল সে । কিন্তু এখন পুকুর-ঘাট খালি , কারণ জলপরী জীবন্ত হয়ে হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে । নিধি তার দিকে তাকাতেই মিষ্টি করে হাসল সে , তারপর ফ্ল্যাটের মেন দরজার দিকে এগিয়ে গেল । নিধিকেও যেন আজ নিশিতে পেয়েছে , সেও মেয়েটার পিছু নিল । ফ্ল্যাটের মেন গেট , তাদের বিল্ডিং এর কোলাপসিবল এবং সবশেষে তাদের কমপ্লেক্সের বিশাল লোহার গেটটা পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে দাঁড়াল দুজনে । অন্ধকার এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। পুব আকাশে একটু পরেই সূয‍্যিমামা উঁকিঝুঁকি মারবেন । একটা হলুদ-কালো ট‍্যাক্সি এসে দাঁড়াল । মেয়েটার সাথে নিধিও
তাতে উঠল । যানবাহনহীন রাস্তায় ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলল ট‍্যাক্সিটা । মিনিট দশেক পরে এসে দাঁড়াল একটা বড় বিল্ডিং-এর সামনে । বিল মিটিয়ে বিল্ডিংটার দিকে এগিয়ে গেল মেয়েটা , মেন গেটের লকে চাবি ঢুকিয়ে ঘোরাতেই সেটা খুলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দেখা মিলল প্রায় পনেরো-কুড়িজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধার । তাঁরা সবাই মেয়েটাকে দেখে ভীষণ খুশি । নিধি বুঝল এটা একটা ওল্ড এজ হোম যার কর্ত্রী হল তার জলপরী । হঠাৎ কোথায় যেন নিধির মোবাইলের আলার্মটা বেজে উঠল ।
চোখ খুলে নিধি দেখল সে তাদের নতুন ফ্ল্যাটের বেডরুমে শুয়ে আছে ।তার মনের কোনে এক পশলা খুশি যেন ঝিলিক দিল । আজ সে রোমিতকে বলবে তার শ্বশুর-শাশুড়িকে এখানে নিয়ে আসতে ।
——————
বিঃদ্রঃ সাপ্তাহিক নির্বাচিত পোষ্ট থেকেই মাসিক নির্বাচিত লেখক নির্বাচন করা হবে। নির্বাচিত লেখকদের রাফার পক্ষ থেকে অভিনন্দন।

শুভেচ্ছান্তে,
রাইটার্স ফাউন্ডেশন (রাফা)

শেয়ার করুন
আপডেট : অক্টোবর ১৬, ২০১৭ — ১২:৩২ পূর্বাহ্ন

১ টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন
  1. অভিনন্দন নির্বাচিত লেখকদের।

মন্তব্য করুন

Muktokolom © 2017 রুদ্র আমিন